যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় উত্থানের প্রভাবে এশিয়ার শেয়ারবাজার সূচক গতকাল তিন বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত এবং মার্কিন সুদহার দ্রুত কমতে পারে, এমন প্রত্যাশা শেয়ারবাজারে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) স্বাধীনতায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় মুদ্রাবাজারে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে ডলারের বিনিময় হার। খবর রয়টার্স।
জাপান ব্যতীত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য দেশের শেয়ারবাজার নিয়ে গঠিত এমএসসিআই সূচক গতকাল ২০২১ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। এছাড়া বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর সূচকও টানা চতুর্থ দিনের মতো নতুন রেকর্ড গড়েছে।
ইউরোপের শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা গেছে। ইউরোস্টক্স ৫০ ও জার্মানির ডিএএক্স সূচকের ফিউচার দাম দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে যুক্তরাজ্যের এফটিএসই সূচকের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক সূচকের ফিউচার দাম দশমিক ১ শতাংশ করে বেড়েছে।
শেয়ারবাজারে এ ইতিবাচক প্রবণতার অন্যতম কারণ হলো ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বিরল খনিজ উপাদান দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ নিয়ে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এ খনিজ উপাদানগুলো আধুনিক প্রযুক্তিপণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে চুক্তিটিকে শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতার দিক থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার জানান, কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের প্রতি কর ও ব্যয় বিল থেকে ‘সেকশন ৮৯৯’ নামের পাল্টা শুল্ক প্রস্তাবটি বাতিল করতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রস্তাবটি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও জি৭ দেশগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক এক চুক্তির পর সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, প্রস্তাবটি বাতিল হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাজারে আস্থা কিছুটা ফিরবে।
এএনজেড ব্যাংকের এশিয়াবিষয়ক গবেষণা প্রধান খুন গো বলেন, ‘এ প্রস্তাব পাস হওয়ার পর থেকে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এটি বাতিল হলে সে উদ্বেগ অনেকটাই কমে যাবে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইতিবাচক খবরে বাজারে যে চাঙ্গা ভাব দেখা যাচ্ছে, এটা তারই প্রতিফলন।’
জাপানের নিক্কেই সূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৪০ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। হংকং ও চীনের মূল ভূখণ্ডের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থির থাকলেও চীনের সিএসআই ৩০০ সূচক সপ্তাহজুড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক উত্থান।
দুদিন ধরে শেয়ারবাজারের নজর ছিল ফেডের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনার দিকে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের জায়গায় নতুন কাউকে নিয়োগ দেয়ার কথা ভাবছেন। এ খবরে আগেই দুর্বল হওয়া ডলারের বিনিময় হার আরো পড়ে গেছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, এতে ফেডের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি চলতি বছর আরো কয়েকবার সুদহার কমানো হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।
এ পরিস্থিতিতে ফেডের সুদহার কমার সম্ভাবনা ও এর নেতৃত্বে পরিবর্তনের জল্পনায় ডলার এখন সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। চলতি সপ্তাহে এর বিনিময় হার কমেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা এক মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এখন পর্যন্ত ডলারের বিনিময় হার ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এটি হবে ফ্লোটিং কারেন্সি ব্যবস্থার শুরু থেকে সবচেয়ে বড় অর্ধবার্ষিক পতন। প্রতি ইউরোর বিনিময় হার বেড়ে পৌঁছেছে ১ ডলার ১৭ সেন্টে, যা গত তিন বছরে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ব্রিটিশ পাউন্ডের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১ ডলার ৩৭ সেন্টে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ম্যাককুয়ারি গ্রুপের বৈশ্বিক মুদ্রানীতি বিশ্লেষক থিয়েরি উইজম্যান বলেন, ‘সময়ের আগেই কাউকে ফেড চেয়ারের বিকল্প হিসেবে ঠিক করার ভাবনা শেয়ারবাজারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত স্বচ্ছতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এর প্রভাব পড়ছে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য প্রত্যাশার তুলনায় কম আসায় সুদহার হ্রাসের সম্ভাবনা আরো জোরালো হয়েছে। শেয়ারবাজারের নজর এখন কোর পিসিই মূল্যসূচকের দিকে, যা গতকাল প্রকাশিত হওয়ার কথা। এটি ফেডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতি নির্দেশক।
বৃহস্পতিবারের পতনের পর এশিয়ার লেনদেন চলাকালে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার স্থির ছিল। এ সময় দুই বছরের বন্ডের সুদহার ৩ দশমিক ৭৪ এবং ১০ বছরের বন্ডের সুদহার ৪ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছায়।